বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

বাড়ছে ডেঙ্গু : ম্যালেরিয়া-কলেরার শঙ্কা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া বা পানিবাহিত কলেরা, ডায়রিয়ার মতো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংক্রামক রোগগুলো বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সংক্রামক রোগই নয়, অসংক্রামক রোগের ওপরও জলবায়ুর প্রভাবের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ নিয়ে লাল সতর্ক সংকেত দিয়েছে দেশটির সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সেন্টার। প্রথমবারের মতো গবেষণায় তারা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শক্তিশালী হয়েছে মশা। মশার জীবনকাল বদলে গেছে। বেড়ে গেছে ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাও। বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিচ্ছে মশা।

শুধু ম্যালেরিয়া নয়, টেক্সাস ফ্লোরিডা, হাওয়াই ও অ্যারিজোনা রাজ্যে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। মশাবাহিত এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে চিন্তায় পড়েছে মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগ। এখন সত্যিকার অর্থেই মশা মারতে কামান দাগানো হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় মশা উপদ্রব বেড়েছে। বাধ্য হয়ে ড্রোনের মাধ্যমে মশা দমনে নেমেছে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় প্রশাসন।

এদিকে, বর্ষার শুরু থেকেই দেশে ভয়াবহ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে ডেঙ্গু। বৃষ্টির এই সময় মশাবাহিত এই রোগটি আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঈদের ছুটিতে যাওয়া মানুষের সঙ্গে ডেঙ্গু দেশের অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সবাই শক সিনড্রোম বা হেমারেজিক উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন বলে জানিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের পরিচালক ডা. মো. খলিলুর রহমান।

তিনি বলেন, গেল কয়েক বছরের তুলনায় এবার আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে ডেঙ্গু। রাজধানীর হাসপাতালে রোগী বাড়ছে। ডেঙ্গু একটি মশা-বাহিত রোগ। তাই মশার কামড়ের হাত থেকে নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে বাঁচান। বাড়ির চারপাশে পানি জমতে দেবেন না। জমা পানিতে মশা বংশবিস্তার করে। পানি জমতে না দিয়ে মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন আর কেবল পরিষ্কার পানিতে নয়, ময়লা আবর্জনাসহ লোনা পানিতেও জন্মাচ্ছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা। কারণ পাল্টে গেছে মশাদের জীবন চক্র। আর এ কারণেই এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে শিশুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত রোগীদের জটিলতাও বাড়ছে। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে, সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্য জনে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা তৎপর হয়ে উঠে। তবে অন্ধকারাছন্ন পরিবেশে দিনের যে কোনো সময় কামড়াতে পারে। এডিস মশা অপেক্ষাকৃত আকারে বড়, লম্বা পায়ে ডোরা কাটা থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে চার হাজার ৯০৮ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। ২০২২ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬২ হাজার ৩৮২ জন মারা গেছেন ২৮১ জন। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ডেঙ্গুতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালে মোট ভর্তি হয়েছিলেন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মারা যান ১০৫ জন। গত বছরের প্রথম ৫ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ছিলেন ৩৫২ জন এবং তাদের মধ্যে কেউ মারা যাননি। সেই হিসাবে, বছরের প্রথম ৫ মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ৩৬০ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ডা. ইকবাল কবীর বলেন, সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেয়ার পর আবারও জ্বর আসতে পারে। এর সঙ্গে শরীরে ব্যথা মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং চামড়ায় লালচে দাগ (র‌্যাশ) হতে পারে। তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিক স্বাস্থ্যবান একজন প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের রক্তে প্লেটলেট সংখ্যা হয় দেড় থেকে সাড়ে চার লাখ প্লেটলেট প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীদের এই সংখ্যা ২০ হাজারের নিচে চলে আসতে পারে। এই সময় রক্তপাতের ঝুঁকি সর্বোচ্চ হয়। মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্লেটলেট সংখ্যা ২১ থেকে ৪০ হাজার থাকে। অবশ্য ডেঙ্গু সংক্রমণে অনেক ক্ষেত্রেই প্লেটলেট সংখ্যার দ্রুত পরিবর্তন হয়। প্লেটলেট কাউন্ট কম এবং রক্তক্ষরণের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তবেই প্লেটলেট প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।

বিশেষ করে দেশে অসংক্রামক রোগে মানুষের মৃত্যুঝুঁকির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ ও গতি-প্রকৃতি প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে। লবণপানির আগ্রাসনে উপকূলের মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও পড়েছেন।

দেশে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, বন্যা ও খরাসহ প্রকৃতির বৈরী আচরণ দৃশ্যমান। অসময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি সময়ে খরায় পুড়ছে মাঠ। আকস্মিক বন্যাও হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পানি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও রাসায়নিক পদার্থ বহন করে থাকে। এতে ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটায় ও নানা কীটপতঙ্গের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ডায়রিয়া-কলেরা ছাড়াও টাইফয়েড, জন্ডিস, চর্মরোগসহ অদৃশ্য রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যা তৈরি করছে। দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। এতে নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যে উদরাময়জনিত রোগ বেড়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে শ্বাসজনিত রোগ হাঁপানি ও অ্যালার্জিজনিত রোগ আরও বেশি হবে। করোনারি আটার্রি বা হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে এবং বিভিন্ন রকম ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

মানুষের বক্ষব্যাধি রোগ বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ার ফলে দরিদ্র মানুষ পর্যাপ্ত ও সুষম খাবারের অভাবে পুষ্টির সমস্যায় পড়ছে এবং অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতঙ্গের স্বাভাবিক জীবনকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে অণুজীব, যেমন, মশা, মাছি, ইঁদুর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে ব্যাপকভাবে বংশ বৃদ্ধি করছে। ফলে বাড়ছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর ইত্যাদি। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মা ও নবজাতকের বিভিন্ন জটিলতা বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন তাপদাহ বাড়ছে। সে সঙ্গে ঝড়-বন্যার কারণে দীর্ঘ দিন জলাবদ্ধতা থাকছে, যেখানে মশা বংশবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। মশার বিস্তারে এই পরিবেশই সব থেকে উপযুক্ত। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক অলিভার ব্র্যাডি বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে মশা শুধু দীর্ঘদিন বাঁচেই না, সেগুলো খুব দ্রুত সংক্রামকও হয়ে ওঠে। তাপমাত্রা বাড়লে মশারা আরও সুবিধা পায়। তাপমাত্রা বাড়লে সকালে-বিকালে লোকজন ঘরের বাইরে চলে আসে, যা মশার দংশনের জন্য উপযুক্ত সময়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com